ফরাসি বিপ্লবের জন্য বোরবোঁ রাজবংশ কতটা দায়ী ছিল? 

ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) পটভূমি তৈরিতে ফ্রান্সের তৎকালীন শাসক বোরবোঁ (Bourbon) রাজবংশের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক এবং সরাসরি। মূলত রাজবংশের স্বৈরাচারী মনোভাব, অদূরদর্শী অর্থনৈতিক নীতি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করেছিল।

পঞ্চদশ লুই


নিচে বোরবোঁ রাজবংশের দায়িত্বের প্রধান দিকগুলো আলোচনা করা হলো:


১. রাজাদের চরম স্বৈরাচারী শাসন 

বোরবোঁ রাজারা ‘রাজপদ হলো ঈশ্বরদত্ত’ (Divine Right Theory) তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। চতুর্দশ লুই গর্ব করে বলতেন, "আমিই রাষ্ট্র"। পরবর্তী রাজা পঞ্চদশ এবং ষোড়শ লুইও জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। এই রাজতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। 


২. দুর্বল নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক অরাজকতা

ষোড়শ লুই ব্যক্তিগতভাবে মন্দ লোক না হলেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল এবং সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা শাসক। তিনি প্রায়ই তার স্ত্রী মারি আঁতোয়ানেত এবং ঘনিষ্ঠ রাজন্যবর্গের প্রভাবে ভুল সিদ্ধান্ত নিতেন। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি প্রবেশ করেছিল, যা ফরাসি শাসনব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। 


৩. ত্রুটিপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থা

বোরবোঁ শাসনের অধীনে ফ্রান্সের কর ব্যবস্থা ছিল চরম বৈষম্যমূলক। অভিজাত ও যাজক সম্প্রদায় (First and Second Estates) কোনো কর দিত না, অথচ সাধারণ দরিদ্র কৃষক ও মধ্যবিত্তদের (Third Estate) ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হতো। বোরবোঁ রাজারা এই বৈষম্য দূর করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।

ষোড়শ লুই ও মেরি আতোয়ানেত 


৪. রাজপরিবারের বিলাসিতা ও অপচয় 

যখন ফ্রান্সের সাধারণ মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় হাহাকার করছিল, তখন ভার্সাই রাজপ্রাসাদে বোরবোঁ রাজপরিবার এবং পারিষদরা চরম বিলাসিতায় মগ্ন ছিলেন। রানি মারি আঁতোয়ানেত-এর অমিতব্যয়িতা এবং উৎসবের খরচ মেটাতে গিয়ে রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়েছিল। তার নামই হয়ে গিয়েছিল 'মাদাম ডেফিসিট' (Madame Deficit)। 


৫. ব্যর্থ অর্থনৈতিক নীতি ও যুদ্ধ

বোরবোঁ রাজারা একের পর এক ব্যয়বহুল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে ফ্রান্সকে দেউলিয়া করে তুলেছিলেন। চতুর্দশ লুইয়ের দীর্ঘকালীন যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে ফ্রান্সের অংশগ্রহণ রাজকোষকে পুরোপুরি শূন্য করে দেয়। ফলে সৃষ্ট মুদ্রাস্ফীতি এবং খাদ্যাভাব জনগণকে বিদ্রোহের মুখে ঠেলে দেয়।


৬. এষ্টেট জেনারেলের অধিবেশনে জেদ ও হঠকারিতা

বিপ্লবের চূড়ান্ত মুহূর্তে ১৭৮৯ সালে ষোড়শ লুই যখন 'এষ্টেট জেনারেল' আহ্বান করেন, তখন তিনি মাথা পিছু ভোটের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তার এই একগুঁয়েমি এবং তৃতীয় সম্প্রদায়ের ওপর দমনমূলক নীতি শেষ পর্যন্ত টেনিস কোর্টের শপথ এবং বাস্তিল দুর্গের পতনের দিকে নিয়ে যায়। 



সম্পূর্ণ ক্লাস টি দেখার জন্য ক্লিক করো করো ☝️☝️


উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায়, ফরাসি বিপ্লব কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। বোরবোঁ রাজবংশের কয়েক দশকের শোষণ, বিলাসিতা এবং সংস্কারহীন শাসনব্যবস্থা ফ্রান্সকে আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড় করিয়েছিল। ষোড়শ লুইয়ের অযোগ্যতা সেই উত্তেজনায় কেবল ঘি ঢেলে দিয়েছিল, যার ফলে রাজবংশের পতনের সাথে সাথে ফ্রান্সে নবযুগের সূচনা হয়।

🍀🍀🍀🍀

Post a Comment

Previous Post Next Post